পারমাণবিক শক্তির যুগে আনুষ্ঠানিকভাবে পা রাখল বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশটি বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মার তীর ঘেঁষে অবস্থিত। এই প্রকল্প রূপায়ণ করছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বিএইসি) ।
প্রকল্পের সাধারণ ঠিকাদার ও নকশাকারী হলো রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন রোসাটমের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর সাধারণ চুক্তির অধীনে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ।
জ্বালানি লোডিং: ঐতিহাসিক মাইলফলক
২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৩টায় রূপপুর প্রকল্প এলাকায় অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ।
এই অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে শুভেচ্ছা জানান আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রসি ।
উপস্থিত ছিলেন রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সি লিখাচেভ এবং প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ ।
প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে মোট ১৬৩টি জ্বালানি অ্যাসেম্বলি লোড করা হবে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ২১ থেকে ৩৪ দিন সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা ।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা
জ্বালানি লোডিং শেষে চুল্লিকে নিয়ন্ত্রিত শক্তির স্তরে নিয়ে আসা হবে। এরপর ধাপে ধাপে শক্তি বৃদ্ধি করা হবে ।
প্রাথমিকভাবে পরীক্ষামূলকভাবে ১ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। পরে তা ২ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত হবে। প্রথম পর্যায়ে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ।
ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জানান, আগামী মাসের মধ্যে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলছে ।
প্রকল্পের কারিগরি বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানে প্রায় ৪ হাজার রাশিয়ান বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলী কাজ করছেন ।
প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিটে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা থাকবে। প্রতিটি ইউনিটের ক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট ।
এখানে ব্যবহার করা হচ্ছে রোসাটমের ফ্ল্যাগশিপ ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর। এটি জেনারেশন থ্রি+ ডিজাইনের অত্যাধুনিক চুল্লি, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ডের সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ ।
চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস বিভাজনের মাধ্যমে প্রচুর তাপশক্তি উৎপন্ন হয়। এই তাপ দিয়ে পানিকে বাষ্পে পরিণত করে টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় ।
প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয়ুষ্কাল ৬০ বছর, যা পরবর্তীতে ২০ বছর করে বাড়িয়ে ১০০ বছর পর্যন্ত করা যাবে ।
ঐতিহাসিক পটভূমি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ধারণা প্রথম আসে ১৯৬১ সালে। এরপর নানা পর্যায়ে সমীক্ষা ও পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে ১৯৯৫ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হয় ।
১৯৯৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি এটি বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় ।
২০২৩ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আকাশপথে রাশিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছায় পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান। অক্টোবরে বিশেষ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সড়কপথে রূপপুরে নিয়ে যাওয়া হয় জ্বালানি ।
২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প এলাকায় পারমাণবিক জ্বালানি আসার পরই পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পায় রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র ।
দ্বিতীয় ইউনিটের অগ্রগতি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও চলছে পুরোদমে। রোসাটম জানিয়েছে, দ্বিতীয় ইউনিট আগামী গ্রীষ্মের মধ্যে কার্যকর হতে পারে ।
দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য সঞ্চালন লাইনের কাজ চলছে। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে তা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে ১,১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে দুটি ইউনিট থেকে মোট ২,২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের আশা করা হচ্ছে ।
সামগ্রিক সুফলতা
এই প্রকল্প শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতীক ।
রূপপুর প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২,৫০০ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া নির্মাণকালে প্রতিদিন প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ কাজ করছেন ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী বলেন, পারমাণবিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ মূলত জাতীয় উন্নয়ন, উদ্ভাবন এবং জনকল্যাণে বিনিয়োগ ।
কেন্দ্রটির সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যা দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে ।